পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় মধ্যে দর্শনেন্দ্রিয়ের বাহ্যিক আধার দুইটি চচ্ছ। সাধারণভাবে বলিতে গেলে ইহা আলোকচিত্র গ্রহণের যন্ত্রবিশেষ কিন্তু কাৰ্য্যতঃ ইহা অতিশয় সূক্ষ্ম ও জটিল। ইহা বিধাতার অপূর্ব সৃষ্টি। অক্ষিগোলক পাঁচখানি অস্থি-সমন্বিত (সম্মুখ কপালাস্থি, গণ্ড-অস্থিদ্বয় এবং নাসা-অস্থিদ্বয়) অক্ষি-কোটরে (orbit) অবস্থিত এবং সম্মুখভাগে পাতা (অক্ষিপুট) ও লোম (পা) দ্বারা সুরক্ষিত।
অক্ষিগোলক, অক্ষিকোটরস্থ সঞ্চিত বসার (fat) মধ্যে অবস্থিত এবং একটি পাতলা অথচ শক্ত আবরণীর দ্বারা বেষ্টিত, ইহাকে ইংরাজীতে বলে fascial sheath of the eyeball. অক্ষিগোলক দুইটি বিভিন্ন আয়তনের বস্তুলাকৃতিবিশিষ্ট খণ্ডের সমষ্টি। সম্মুখের খন্ডটি আয়তনে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র, স্বচ্ছ এবং সমগ্র অক্ষিগোলকের ষষ্ঠাংশ (one sixth of the eyeball); পশ্চাদ্ভাগের খণ্ডটি আয়তনে অপেক্ষাকৃত বৃহৎ অস্বচ্ছ, এবং সমগ্র অক্ষিগোলকের ৫/৬ অংশ।
৫২০
হোমিও পারিবারিক চিকিৎসা
সমগ্র অক্ষিগোলক চিনটি কোষের সমষ্টি এবং ইহার মধ্যস্থ দ্রব্যগুলি উত্ত তিনটি কোষবেন্টিত। বাহির হইতে ভিতরের দিকে উক্ত কোষ তিনটি বর্ণিত হইতেছে ঃ-(১) (coat fibrous) কোষ যাহার সম্মুখভাগে কর্ণিয়া (cornea) এবং পশ্চাতে selera; (২) রক্তবহা নাড়ীজালবেন্টিত বর্ণময় (pigmented) কোষ (vascular, pigmented coat)। উহার পশ্চাৎ হইতে সম্মুখে যথাক্রমে আছে choroid ciliary body, iris; (৩) সংজ্ঞাবহা নাড়ীজাগবেষ্টিত কোর (nervous coat)- ইহাকে বলে Retina (চিত্রপত্র)।
চৎ খোলকের পশ্চাদ্দিকের মধ্যভাগে একটি ছিদ্র আছে; মস্তিষ্ক হইতে একটি বাড়ী যাহাকে দৃষ্টি-বাড়ী (optic nerve) বলা হয় এই রন্দ্র দিয়া আসিয়া অক্ষিগোলককে ধারণ করিয়া আছে। বোঁটাতে যেমন ফল থাকে উত্ত বাড়ীতে তেমনিই অক্ষিগোলক সংযুক্ত আছে। চিত্রপত্র (Retina) দৃষ্টিনালীর প্রবেশ পথ হইতে আরম্ভ হইয়া choroid ও ciliary body-র সংযোগ-স্থান পর্যান্ত আসিয়া শেষ হইয়াছে। Iris নামক পর্দার ঠিক পশ্চাতে বহির্বর্তলকাচের এত (convex lens) একটি স্বচ্ছ পদার্থ আছে Cornea ও lens-এর মধ্যে যে স্থান আছে (anterior chamber) তাহাতে জলবৎ পদার্থ বর্তমান (aquous humor) এবং lens ও retina বা চিত্রপত্র মধ্যে (posterior chamber) অন্তলালবং পদার্থ আছে-তাহাকে vitreous humor বলে।
চতুর তারা দিয়া আলোক রশ্মি অক্ষিগোলক-গহ্বরে প্রবেশ করিয়া চিত্রপত্রে পতিত হইয়া দৃষ্টিনাড়ী দ্বারা বাহিত হইয়া মস্তিষ্কের এক বিশেষ সস্থানে দর্শনজ্ঞান অনুভূত হয়। ছয়টি ক্ষুদ্র মাংসপেশী দ্বারা অক্ষিগোলক চাচ্ছ-কোটরে আকখ। এই সকল মাংসপেশীর সাহায্যে চক্ষুকে যেরূপভাবে ইচ্ছা ঘুরাইয়া ফিরাইয়া অভীষ্ট বস্তু লক্ষ্য করা যায়।
চৎকে ধূলা-বালি হইতে রক্ষার জন্য অক্ষিপুট বা চোখের পাতা (eyelids) এবং আর্দ্রতা হইতে রক্ষা করিবার জন্য পদ্মা (eye lashes) আছে।
অক্ষিগোলকের ঊর্ধ্বভাগে এবং নাসিকার বিপরীত দিকের কোণে অনু-গ্রন্থি (lachrymal gland) অবস্থিত। ইহার আকার এবং আয়তন অনেকটা ছোট এলাচের মত। দুঃখ বা আহনাদ হইলে অথবা চোখে কিছু
চন্দ্র-রোগ
৫২১
পড়িলে এই গ্রন্থি হইতে জল বাহির হয়। চিত্রসহ বিস্তারিত বিবরণের জন্য শ্রীমাদের সচিত্র “নরদেহ পরিচয়” দ্রষ্টব্য।
অক্ষিগোলক ও তৎসংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি যন্ত্রেরই রোগ হইতে পারে। নিম্নে চচ্ছ-রোগের কয়েকটি প্রধান ঔষধের বিবরণ দেওয়া হইলঃ-
চচ্ছ-রোগের কতিপয় প্রধান ঔষধ
অরাম-মেট ৬.০ বিচূর্ণ’, ২০০-চচ্ছর বহির্ভাগ হইতে উহার অভ্যন্তরে চারিদিকে যেন বেদনা ছড়াইয়া পড়িতেছে এইরূপ অনুভব।
অ্যাসাফিটিডা ২. ৬ চচ্ছর ভিতর হইতে বহির্ভাগের চতুর্দিকে যেন বেদনা বিস্তৃত হইতেছে এইরূপ বোধ।
আর্জেন্টাম-নাইট্রিকাম ৩ চচ্ছ জুড়িয়া যাওয়া বা চক্ষু হইতে পূজ নিঃসরণ: চতুর সম্মুখে যেন সর্প’ বেড়াইতেছে।
আর্সেনিকাম-অ্যালাম ৩ জালাকর অস্ত্র, গন্ডদেশে পড়িলে যেন হাজিয়া যায়।
অ্যাকোনাইট ৩-অজ্ঞাত কারণে সহসা দৃষ্টিশক্তি লোপ পাইলে।
অ্যামারিকাস ৩-অক্ষিপুট-পেশীর সঙ্কোচন লক্ষণে।
অ্যালিয়াম-সিপা ৬ চচ্ছ দিয়া অধিক পরিমাণে জল পড়িলে ও চচ্ছ কর কর করিলে। সর্দি; নাক দিয়া জল পড়া; বারম্বার হাঁচি।
ইউপেটো-পার্ফ ৩-চোখ হইতে জল নিঃসরণ এবং চক্ষুতারা টাটানিযুক্ত (বিশেষতঃ কাসিবার সময়)। নেট্রাম-মিউর ১২০ বিচূর্ণ, ৩০ ফলপ্রদ।
ইউফ্রেসিয়া ৩-চক্ষু হইতে জালাকর স্রাব, প্রচুর অশ্রুপাত, চক্ষুর পাতা লালবর্ণ, প্রাতে চচ্ছ জুড়িয়া যায়, কনীনিকা (cornea)-তে পিচুটি।
(ইউফ্রেসিয়া ও আটগুণ জলে মিশাইয়া বাহ্যপ্রয়োগ)।
অ্যাইল্যান্থাস ৩-চক্ষুতে রক্ত-সঞ্চয়, অক্ষিতারা বিস্তৃত।
এদিস ৬নীচের পাতা ফোলা, সূচীবিদ্ধ বেদনা, ঠান্ডায় উপশম।
কষ্টিকাম ৬ উপর পাতা বুজিয়া যায়, কিছুতেই চোখ খুলিয়া রাখিতে পারে না।
কেলি-কার্ব ৩০-চক্ষুর উপর পাতার স্ফীতি, চটচটে স্রাব।
কেলি-সাল্ফ ৬০-চক্ষু হইতে পূজবৎ স্রাব।
হোমিও পারিবারিক চিকিৎসা
ক্লিমেডিস ৩-চক্ষু শুষ্ক, লাল ও গরম চক্ষুর মধ্যভাগে জ্বালাকুর বেদনা, ঠান্ডায় বা রাত্রিতে রোগের বৃদ্ধি: চক্ষু হইতে জল নিঃসরণ।
8 ক্রোটেনাস ৩-চক্ষু দিয়া রক্ত পড়িলে যা চচ্ছ হরিদ্রাবর্ণ লক্ষণে।
জেন্সিমিয়াম ৩-চক্ষু-পেশীর স্পন্দন বা অবশতা। ক্ষীণদৃষ্টি শিরোশন। দ্বিত্ব-দৃষ্টি; চক্ষুতারা প্রসারণ; চক্ষুর স্নায়ুশূল।
গালেন্সটিলা ৬-০চ্ছ আরক্ত, খালি জায়গায় বা ঠান্ডা বাতাসে চোখ
দিয়া পুজ পড়িলে; হরিদ্রাবর্ণের স্রাব। পাল্স ৩০ আঞ্জনির (বিশেষতঃ চক্ষুর উপর পাতায় আঞ্জনি হইলে) উৎকৃষ্ট ঔষধ।
ভ্রুণাস-স্পাইনোসা ও অন্য কোন উপসর্গ ব্যতীত চক্ষুতে দারুণ যন্ত্রণা। গ্লোবিউল মূল-অরিষ্টে সদ্য সিক্ত করিয়া সেবনে উপকার দর্শে।
প্ল্যাটিনা ৬ কোন বস্তু উহার প্রকৃত আয়তন অপেক্ষা ক্ষুদ্র দেখাইলে।
প্ল্যাটেনাস -অক্ষিপুটের অর্বুদ, পূজকোষ, আঞ্জনি, ছানি প্রভৃতি। আধ আউন্স জলে পাঁচ ফোঁটা (মূল অরিষ্ট) মিশাইয়া চোখ ধুইয়া ফেলা বিধি।
ফাইজস্ টিস্ম্মা ০-চক্ষু কর কর করিলে এবং ঐ বেদনা চশমা ব্যবহারেও উপশমিত না হইলে।
বেলেডোনা ৬-মোটেই আলোক সহ্য না হওয়া; চক্ষু লাল, প্রসারিত, দপদপে বেদনা, মস্তক পর্য্যন্ত বেদনার বিস্তৃতি।
বোরাক্স ৩০ চূর্ণ-চক্ষুর পাতায় ছোট ছোট ফুস্কুড়ি, অক্ষিপুটের লোম জুড়িয়া যাওয়া, চক্ষুর পাতা ভিতরদিকে উল্টে যাওয়া, চক্ষুর কোণে চুলকানি
ও বেদনা।
রাস-টক্স ৬-সমস্ত চক্ষু ও উহার চতুর্দিকে স্ফীতি। উত্তপ্ত অনুস্রাব, পাতা ভারী ও শক্ত বোধ।
রুটা ৩-সেলাই বা পাঠ করা প্রভৃতি কারণে চোখ লাল ও গরম এবং বেদনাযুক্ত, রাত্রিতে পুস্তকাদি পাঠে চোখ জ্বালা; আলোর চতুর্দিকে সবুজ বেষ্টনী দর্শন; চোখের উপর জোর দিয়া পড়িলে বা কোন জিনিস দেখিলে মাথাধরা।
ট্যাফিসেগ্রিয়া ৬-অক্ষিপুটে শক্ত মাংসপিন্ড বা উচ্চ গুটিকা কিম্বা অস্থিগুল্ম (nodes) হইলে।
স্ট্যামোনিয়াম ৩-দ্বিত্ব-দর্শ’ন: তির্যাক-দৃষ্টি; ছোট জিনিস বাড় এবং সব জিনিসই কাল দেখা: চোখ বড় করিয়া একসন্টে চাহিয়া থাকা; চক্ষুতারা প্রসারণ।
সাইকিউটা ৩-চক্ষু-তারকার বিস্তার; চচ্ছ অসাড় ও ট্যারাদৃষ্টি: অক্ষরসমূহ উচু-নীচ দেখা বা একেবারেই দেখিতে না পাওরা।
সিনা ৩০, ২০০-ঝাপসা দৃষ্টি, কিন্তু চচ্ছ রগড়াইবার পর অপেক্ষাকৃত পৃষ্ট দর্শন।
সালফার ৩০-চোখে জ্বালা, চোখে যেন বালি পড়িয়াছে; চচ্ছ হইলে যন্ত্রণার বৃদ্ধি: চক্ষুর সম্মুখে যেন জাল পড়িয়াছে; চোখে যেন পশুচ ফুটিতেছে।
সাইক্ল্যামেন ০-অস্পষ্ট দৃষ্টি, চক্ষুর সম্মুখে যেন ধোঁয়া বা কুয়াশা রহিয়াছে।
সিপিয়া ১২-চক্ষু ভারবোধ (পক্ষাঘাত হেতু) ও চক্ষুর পাতা আপনা-আপনি মুদিত হওয়া লক্ষণে।
সিমিসিফিউগা ৬-অক্ষিগোলকে বেদনা; চক্ষুতে বা কর্ণে অবিরত উৎকট বেদনা হইতে থাকিলে উহার চারিপার্শ্বের ত্বকের উপর তুলি দিয়া সিমিসিফিউগা লেপন এবং ৩য় ক্রম সেবনে উপকার দর্শে’।
সিলিকা ৩০-অশ্রুস্রাবী গ্রন্থির শোষ। আলো বা রোদ দেখিলে মাথা ঘোরে, দৃষ্টি-বিভ্রম, পড়িতে গেলে সব অক্ষর যেন জড়াইয়া যায়; ছানি. আঞ্জনি বা চোখের পাতার উপর ছোট শক্ত আবু বা মাংসপিন্ড।
আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা-পেট সর্বদা খারাপ থাকিলে, বহুমূত্র রোগে, উচ্চরক্তচাপ থাকিলে চোখ সহজেই খারাপ হয়। ঐসকল রোগ সুচিকিৎসিত হইলে চক্ষু আপনা হইতেই ভাল থাকে।
পথ্য। দুধ, ঘি, ফল এবং সহজপাচ্য পুষ্টিকর খাদ্য।
অপথ্য।-সূরা, ধূমপান ইত্যাদি।
E
Leave a Reply